বিরিশিরি ভ্রমন ৩


নদী থেকে ফিরে বিরিশিরি বাজারে গিয়ে গারো মালিকানার হোটেলে চা নাস্তা খেয়ে আবার হাটতে হাটতে নদীর উপর ব্রিজে দাড়াই। নীচে সোমেশ্বরী আর আকাশে লক্ষ লক্ষ তারা। বিশাল আকাশ। শহরে এত বড় আকাশ দেখা যায় না। এই মায়াবী পরিবেশে ঘন্টা খানেক কাটিয়ে ফিরে চললাম একাডেমি গেষ্ট হাউসে। রাতে খাবারের বিষয়ে ইকবালের একটা প্রস্তাব ছিল যে এখানে চুলা আছে আমার হোটেলে না খেয়ে বরং নিজেরা রান্না করে খাই। বেড়াতে এসে মুন্নী রান্না করতে রাজী হবে না ভেবেছিলাম। কিন্ত দেখা গেল সে নিজে থেকেই সবাইকে রান্না করে খাওয়াতে উৎসাহী। সেদিন অনেক জার্নি হয়েছে তারপর রাত হয়ে গেছে সেজন্য রান্না না করে হোটেল থেকে খাবার আনার সিদ্ধান্ত হয়। হৃদয় হাজং কে নিয়ে সেই গারো হোটেলে রাতে খাবার ওসকালের নাস্টার অর্ডার দিই। হোটেল থেকে গেস্ট হাউসে খাবর পৌছে দেয় সময় মত।

বিরিশিরি নিয়ে দুইটা কথা বলি। বিরিশিরি বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী একটি গ্রাম। নেত্রকোনা থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইংরেজ শাসন আমলে স্থাপিত শত বছরের পুরনো বয়েজ ও গালর্স হাই স্কুল, সরকারী উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী, সোমেশ্বরী নদী, সাগর দিঘী, পুরাকীর্তি নিদর্শন মঠগড়, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ আর দর্শনীয় স্খানগুলোর কারনে পর্যটকদের কাছে এটির যেথষ্ট সুনাম আছে।



দূর্গাপুর উপজেলায় বাঙালি ছাড়াও গারো ও হাজং ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠির বাস। গারোরা সংখ্যায় অনেক বেশি ও বেশির ভাগ খ্রিষ্টান। হাজংরা সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সংখ্যায় মাত্র চব্বিশ হাজার। হাজংরা খুবই সহজ সরল ও হাসি খুশি প্রকৃতির মাটির মানুষ। একেবারে সীমান্তের কাছে হলেও দূর্গপুর উপজেলা উন্নত মনে হল। সিনেমা হল, স্কুল কলেজ , কমিনিউটি সেন্টার হাট বাজারে সমৃদ্ধ।

খারাপ লাগল যে বাজারের দোকানের নিরানব্বই ভাগ মালিকই বাঙালি। মাঠের জমির মালিকও বাঙালি কীনা কে জানে। তবে বাঙালি আদি বাসীদের মধ্যে সম্প্রীতি আছে আপাত দৃষ্টিতে মনে হল। বাঙালীর দোকানে আদিবাসি আবার আদিবাসির দোকানে বাঙালি বসে চা বিস্কুট খাচ্ছে । একসাথে গল্প গুজব করছে। বাঙালি মোটর সাইকেল চালকের পেছেন বসে যাত্রি হয়ে দুইজন গারো মেয়েকে রাস্তা পাড়ি দিতে দেখা গেল।

আমাদের কেয়ার টেক করছে হৃদয় হাজং। জীবনে এই প্রথম একজন হাজং সম্প্রদায়ের লোকের সাথে দেখা। আমরা চেষ্টা করলাম যতটুকু পারা যায় তাদের জীবন যাপন সংস্খৃতি সম্মন্ধে জানার। কিন্তু হৃদয় হাজং দের আলাদা সংস্কৃতি প্রকাশ করার চাইতে বাঙলিদের সাথে তাদের মিল দেখাতেই আগ্রহী বেশি। বার বার চেষ্টা করেও স্পেশাল হাজং খাবারের নাম বের করতে পারলামনা। বলে বাঙালিদের মত ভাত মাছ খায়। হতেও পারে। আমাদের সাথে চেহারায় মিল আছে বাংলাও সবাই ভালো বলতে পারে।

আজকের মত যাতে ঝামেলা না হয় সেজন্য রাতে গেষ্ট হাউজে ফিরে আগামি কালকের ভ্রমন যোগ্য স্থান নির্বাচন করার জন্য মিটিং এ বসা হল। বাংলা লিংক বাংলার পথের ব্লগার টিংকু ট্রাভেলারের টিপস প্রিন্ট করা ছিল সাথে। ঠিক হয় প্রথমে যাব রিক্সা সহ নদী পার হয়ে বিজয়পুর চীনা মাটির খনি দেখতে। সেখান থেকে রাশিমনি হাজংয়ের সৌধ। তারপর ইকবালের বিশেষ আগ্রহে টংক আন্দোলনের নেত্রী জীবন্ত কুমুদিনী হাজং এর সাথে দেখা করা। সেখান থেকে রানীখং পাহাড়ের উপর সাধু যোসেফের গীর্জা।

গ্রামের রাস্তায় চলার উপায় দুইটা, মোটর সাইকেল ও রিক্সা। আমাদের গন্তব্য বিরিরিশিরি থেকে বেশ দূরে সীমন্ত সংলগ্ন হওয়ায় মোটর সাইকেলই উপযুক্ত যানবাহন ছিল। কিন্তু সাথে মহিলা ও বাচ্চা থাকায় কাল সারা দিনের জন্য দুইটা রিক্সা ভাড়া করা হয়। রিক্সা চালকদ্বয়ের নাম সুলতান ও সুমন। সুলতানের আবার মোবাইল আছে। ওদের বলা হয় পরের দিন সকাল সোয়া আট টায় রিক্সা নিয়ে হাজির থাকার জন্য।


মন্তব্য

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বিরিশিরি ভ্রমন ৬ : সাধু যোসেফের ধর্ম পল্লী ও ডাহুপাড়া বনে

বিরিশিরি ভ্রমন ৫ : কুমুদিনী হাজং এর সাথে সাক্ষাত

বিরিশিরি ভ্রমন ৪ :চীনা মাটির পাহাড়ে